নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজটি হলো ভোটার নিবন্ধন ফরমের নিচের অংশ বা ভোটার স্লিপ। অনেক সময় অসাবধানতাবশত এই স্লিপটি হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। স্মার্ট কার্ড হাতে পাওয়ার আগে বা অনলাইন থেকে আইডি কার্ড ডাউনলোডের জন্য এই স্লিপটি অত্যন্ত জরুরি। যদি আপনার ভোটার স্লিপ হারিয়ে গেলে করণীয় সম্পর্কে জানা না থাকে, তবে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থায় ভোটার স্লিপ পুনরুদ্ধার করা এবং স্লিপ ছাড়াই এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করার বেশ কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে।
Table of Contents
ভোটার স্লিপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যখন একজন নাগরিক নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হন, তখন তাকে একটি ইউনিক নম্বর সম্বলিত টোকেন বা স্লিপ দেওয়া হয়। এটি প্রমাণ করে যে আপনি ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই স্লিপটি মূলত দুটি প্রধান কাজে লাগে:
১. অনলাইনে এনআইডি কার্ডের কপি বা NID Online Copy ডাউনলোড করতে।
২. সরাসরি নির্বাচন অফিস থেকে স্মার্ট কার্ড বা লেমিনেটেড আইডি কার্ড গ্রহণ করতে।
অনেকেই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর নিবন্ধন শেষ করে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেন। এই দীর্ঘ সময়ে ছোট এক টুকরো কাগজ বা স্লিপটি হারিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। নিচে আমরা আলোচনা করব কিভাবে এই হারানো স্লিপ বা তথ্য ফিরে পাবেন।
আরও জেনে নিনঃ NID ফর্ম নম্বর ভুল দেখালে করনীয়
ভোটার স্লিপ হারিয়ে গেলে করণীয়: প্রাথমিক পদক্ষেপ
আপনার ভোটার স্লিপটি হারিয়ে গেলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। আপনার নিবন্ধন তথ্য যেহেতু ডাটাবেজে সংরক্ষিত আছে, তাই এটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
১. উপজেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ
ভোটার স্লিপ হারিয়ে গেলে আপনার প্রথম কাজ হলো আপনার স্থায়ী ঠিকানার আওতাধীন উপজেলা নির্বাচন অফিসে যাওয়া। সেখানে গিয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন।
২. ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে তথ্য পুনরুদ্ধার
নির্বাচন অফিসে গিয়ে আপনি যখন স্লিপ হারানোর কথা বলবেন, তখন তারা আপনার বায়োমেট্রিক বা আঙ্গুলের ছাপ (Fingerprint) যাচাই করতে পারেন। তাদের সার্ভারে আপনার আঙ্গুলের ছাপ ম্যাচ করলেই আপনার ভোটার ফরম নম্বর এবং অন্যান্য তথ্য স্ক্রিনে চলে আসবে। এরপর তারা আপনাকে নতুন করে একটি স্লিপ বা আপনার ভোটার নম্বর প্রদান করবেন।
ভোটার স্লিপ ছাড়া এনআইডি কার্ড বের করার কৌশল
স্লিপ হারিয়ে গেলেও স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে আপনি আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র বের করতে পারেন। এর জন্য নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করুন:
১০৫ নম্বরে কল বা এসএমএস
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইন নম্বর হলো ১০৫। আপনি যেকোনো মোবাইল থেকে এই নম্বরে কল করে আপনার নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম এবং জন্ম তারিখ প্রদান করলে তারা আপনার এনআইডি নম্বর জানিয়ে দেবে। এছাড়া এসএমএসের মাধ্যমেও তথ্য পাওয়া সম্ভব। সাধারণত নতুন ভোটারদের মোবাইল নম্বরে এনআইডি নম্বর পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ভোটার তালিকা থেকে নম্বর সংগ্রহ
প্রত্যেকটি ওয়ার্ড বা ইউনিয়নে হালনাগাদ ভোটার তালিকা থাকে। আপনি যদি স্থানীয় মেম্বার বা কাউন্সিলর অফিসে গিয়ে ভোটার তালিকায় আপনার নাম খুঁজে বের করতে পারেন, তবে নামের পাশেই আপনার ‘ভোটার নম্বর’ দেখতে পাবেন। এই ভোটার নম্বর ব্যবহার করেই অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব।
অনলাইনে এনআইডি কার্ড ডাউনলোড করার নিয়ম
ভোটার স্লিপ বা ভোটার নম্বর পাওয়ার পর আপনি ঘরে বসেই আপনার আইডি কার্ডের অনলাইন কপি সংগ্রহ করতে পারবেন।
| ধাপ | করণীয় কাজ |
| ধাপ ১ | নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (services.nidw.gov.bd) এ যান। |
| ধাপ ২ | ‘রেজিস্ট্রেশন করুন’ বাটনে ক্লিক করে ফরম নম্বর বা ভোটার নম্বর দিন। |
| ধাপ ৩ | আপনার সঠিক জন্ম তারিখ (দিন-মাস-বছর) প্রদান করুন। |
| ধাপ ৪ | বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার বিভাগ, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন করুন। |
| ধাপ ৫ | এনআইডি ওয়ালেট (NID Wallet) অ্যাপের মাধ্যমে ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন। |
| ধাপ ৬ | লগইন শেষে ‘ডাউনলোড’ অপশনে ক্লিক করে পিডিএফ কপিটি সংগ্রহ করুন। |
ভোটার স্লিপ ছাড়া কি স্মার্ট কার্ড পাওয়া সম্ভব?
সাধারণত স্মার্ট কার্ড বিতরণের সময় মূল স্লিপটি জমা দিতে হয়। তবে আপনার কাছে যদি স্লিপ না থাকে, সেক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। আপনি যদি অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা এনআইডি কার্ডের কপি এবং স্লিপ হারানো সংক্রান্ত একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) কপি নিয়ে যান, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্মার্ট কার্ড প্রদান করা হয়। তবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
আরও জেনে নিনঃ নতুন ভোটার হতে বা ভোটার আবেদন করতে কত টাকা লাগে
ভোটার স্লিপ সংক্রান্ত সাধারণ কিছু সমস্যা ও সমাধান
অনেকেই প্রশ্ন করেন যে ভোটার স্লিপ কি পুনরায় প্রিন্ট করা যায়? সরাসরি ভোটার স্লিপ পুনরায় প্রিন্ট করা না গেলেও সেই নম্বরটি ব্যবহার করে ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করা যায়। এছাড়া যারা অনেক আগে ভোটার হয়েছেন কিন্তু এখনো কার্ড পাননি, তারা তাদের হারানো স্লিপ উদ্ধারের জন্য অবশ্যই নির্বাচন অফিসের ‘এনআইডি অনুবিভাগ’ এ যোগাযোগ করবেন।
ভোটার স্লিপ পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি
আপনি যখন নির্বাচন অফিসে স্লিপ তুলতে যাবেন, তখন সাথে করে নিচের তথ্যগুলো নিয়ে রাখা ভালো:
- আপনার পূর্ণ নাম।
- পিতা ও মাতার নাম।
- সঠিক জন্ম তারিখ।
- নিবন্ধন করার সময় যে মোবাইল নম্বর দিয়েছিলেন সেটি।
সতর্কবার্তা
ভোটার স্লিপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথি। এটি হারিয়ে গেলে আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই স্লিপ পাওয়ার পর সেটি যত্ন করে রাখা বা মোবাইলে ছবি তুলে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। যদি হারিয়েই যায়, তবে দ্রুত স্থানীয় থানায় একটি জিডি করে রাখা নিরাপদ।
ভোটার স্লিপ সম্পর্কিত জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ভোটার স্লিপ পুনরায় সংগ্রহ করতে কি কোনো ফি দিতে হয়?
না, ভোটার স্লিপ বা তথ্য উদ্ধারের জন্য সরকারিভাবে কোনো ফি নির্ধারিত নেই। তবে অফিস থেকে কপি প্রিন্ট করার ক্ষেত্রে নামমাত্র প্রিন্টিং চার্জ লাগতে পারে।
আমি কি অন্য এলাকার নির্বাচন অফিস থেকে স্লিপ তুলতে পারব?
সাধারণত আপনি যে এলাকায় নিবন্ধিত হয়েছেন, সেই এলাকার উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকেই তথ্য পাওয়া সহজ হয়। তবে বর্তমানে কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকেও তথ্য যাচাই করা সম্ভব।
এনআইডি নম্বর পেতে কত সময় লাগে?
আপনার তথ্য যদি ডাটাবেজে আপলোড হয়ে থাকে, তবে ১০৫ নম্বরে কল করলে ২-৩ মিনিটের মধ্যেই আপনি আপনার এনআইডি নম্বর পেতে পারেন।
স্লিপ হারিয়ে গেলে কি আবার নতুন করে ভোটার হতে হবে?
না, একবার ভোটার তালিকায় নাম উঠলে আর নতুন করে ভোটার হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনার পুরনো তথ্যই পুনরুদ্ধার করা যাবে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, ভোটার স্লিপ হারিয়ে গেলে করণীয় নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন শুধু আঙ্গুলের ছাপ বা মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমেই আপনার হারানো তথ্য ফিরে পাওয়া সম্ভব। ভোটার স্লিপ পুনরুদ্ধার করতে উপজেলা নির্বাচন অফিসের সহযোগিতা নিন অথবা ১০৫ হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন। মনে রাখবেন, সচেতনতাই আপনার নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ। হারানো স্লিপ উদ্ধারের পর দ্রুত অনলাইন থেকে আইডি কার্ড ডাউনলোড করে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।





