সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী ২০২৬ ( আপডেট তথ্য)
সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী সম্পর্কে জানেন কি? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সাল একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ দেখে অভ্যস্ত হলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (13th National Election) পর রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন দেশজুড়ে আলোচনার প্রধান বিষয় হলো সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী এবং এই নতুন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ক্ষমতা কীভাবে ভাগ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, কেন এই পরিবর্তন এবং এটি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কী ধরণের প্রভাব ফেলবে। আজকের এই আর্টিকেলে আজ আমরা আপনাকে সংসদের এই নতুন রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যখন একটি দেশের আইনসভা বা সংসদ দুটি আলাদা অংশে বা কক্ষে বিভক্ত থাকে, তখন তাকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা বলা হয়। এখানে একটিকে বলা হয় নিম্নকক্ষ (Lower House) এবং অন্যটিকে বলা হয় উচ্চকক্ষ (Upper House)। বিশ্বের অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে যেমনঃ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হওয়া এই ব্যবস্থায় নিম্নকক্ষকে বলা হচ্ছে ‘জাতীয় সংসদ’ এবং উচ্চকক্ষকে বলা হচ্ছে ‘সিনেট’ বা ‘পরিষদ’।
সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে যে, নিম্নকক্ষ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়। অন্যদিকে, উচ্চকক্ষ সাধারণত বিশেষজ্ঞ, প্রবীণ রাজনীতিক বা বিভিন্ন দলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয়। যাদের কাজ হলো আইন প্রণয়নে আরও গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করা।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা কী?
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ হলো এমন একটি আইনসভা যেখানে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দুটি পৃথক কক্ষ থাকে। বিশ্বের অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে এই ব্যবস্থা চালু আছে। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং যেকোনো আইন পাশের আগে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশে ২০২৬ সাল থেকে যে নতুন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে, তাতে সংসদের এই দুটি কক্ষের দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
আরও জানতে পারেনঃ গণভোট ২০২৬: হ্যাঁ না ভোট কি এবং সংবিধানে যেসব বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে
নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদ (Lower House) ক্ষমতার মূল ভিত্তি
বাংলাদেশের নতুন সংসদীয় কাঠামোতে নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদই হবে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। এটি সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে।
- সদস্য সংখ্যা: নিম্নকক্ষে মোট সদস্য সংখ্যা হবে ৩৫০ জন। এর মধ্যে ৩০০ জন সরাসরি সাধারণ আসন থেকে নির্বাচিত হবেন এবং ৫০টি আসন সংরক্ষিত থাকবে নারীদের জন্য।
- ক্ষমতা ও দায়িত্ব: রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমনঃ বাজেট (National Budget) ও অর্থ সংক্রান্ত সকল বিল পাশের একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকবে এই নিম্নকক্ষের হাতে। অর্থাৎ, দেশের টাকা-পয়সা কোথায় খরচ হবে এবং কীভাবে কর আদায় করা হবে তা নির্ধারণ করবেন সরাসরি নির্বাচিত এই ৩৫০ জন সদস্য।
নিম্নকক্ষের সদস্যরা সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। তাই তাদের হাতেই নীতিনির্ধারণী বড় ক্ষমতাগুলো রাখা হয়েছে।
উচ্চকক্ষ বা সিনেট (Upper House/Senate)
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার দ্বিতীয় অংশটি হলো উচ্চকক্ষ বা সিনেট। এটি একটি নতুন ধারণা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। নিম্নকক্ষের প্রথম অধিবেশন বসার ২১০ দিনের মধ্যে এই উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
- সদস্য সংখ্যা ও নির্বাচনের পদ্ধতি: উচ্চকক্ষে মোট সদস্য থাকবেন ১০০ জন। তবে এদের নির্বাচনের পদ্ধতি নিম্নকক্ষের মতো সরাসরি নয়। এটি গঠিত হবে সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে (Proportional Representation – PR Method)। সহজভাবে যদি বলা হয় তাহলে, কোনো রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে মোট ভোটের ৪০% পায় তবে উচ্চকক্ষে তারা ৪০টি আসন পাবে।
- কাজের ধরণ: উচ্চকক্ষকে বলা হয় ‘দ্বিতীয় চিন্তার’ (Second Thought) ঘর। নিম্নকক্ষ থেকে কোনো বিল পাশ হওয়ার পর সেটি উচ্চকক্ষে আসবে। উচ্চকক্ষের সদস্যরা সেই বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবেন। কোনো ভুলভ্রান্তি থাকলে তা চিহ্নিত করবেন এবং পুনর্বিবেচনার জন্য পরামর্শ দেবেন।
সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী ? বিস্তারিত আকারে জানুন
নতুন এই কাঠামোতে দুই কক্ষের ক্ষমতআ ও গঠনের মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে। যেমনঃ
| বিচারের মাপকাঠি | নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) | উচ্চকক্ষ (সিনেট/পরিষদ) |
| গঠন পদ্ধতি | জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। | প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে (PR Method) মনোনীত। |
| সদস্য সংখ্যা | ৩০০ (নির্বাচিত) + ৫০ (সংরক্ষিত নারী) = ৩৫০ জন। | মোট ১০০ জন। |
| অর্থ বিল ও বাজেট | একচ্ছত্র ক্ষমতা। | কোনো ক্ষমতা নেই, কেবল পর্যালোচনা। |
| আইন প্রণয়ন | বিল উত্থাপন ও প্রাথমিক পাস। | বিলের ভুলভ্রান্তি যাচাই ও পুনর্বিবেচনা। |
| সংবিধান সংশোধন | দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্যের ভোট প্রয়োজন। | সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোট প্রয়োজন। |
| মেয়াদকাল | ৪ বছর। | ৪ বছর (নিম্নকক্ষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ)। |
আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থায় যেকোনো আইন প্রণয়ন করতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। প্রস্তাবিত আইনটি প্রথমে বিল আকারে নিম্নকক্ষে উত্থাপিত হয়। নিম্নকক্ষে পাশ হওয়ার পর সেটি উচ্চকক্ষে পাঠানো হয়। তবে অর্থবিল (Money Bill) বা বাজেটের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের কেবল পর্যালোচনার অধিকার থাকলেও তা আটকে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবিধান সংশোধন (Constitutional Amendment)। বাংলাদেশের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সংবিধানের কোনো ধারা পরিবর্তন করতে হলে নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ (Two-thirds majority) সদস্যের সমর্থন যেমন লাগবে। তেমনি উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের (Simple majority) ভোটও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে কোনো একক দল চাইলেই নিজেদের ইচ্ছামতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। এটি এক ধরণের ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ হিসেবে কাজ করবে।
কেন এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় সংস্কার?
সংসদীয় সংস্কার কমিশনের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একক দলের যে আধিপত্য বা স্বেচ্ছাচারিতা (Autocracy) দেখা গেছে তা বন্ধ করার জন্যই এই উদ্যোগ। উচ্চকক্ষ গঠিত হলে নিম্নকক্ষের নেওয়া যেকোনো আবেগপ্রসূত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হবে। এছাড়া আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) পদ্ধতির কারণে সংসদে ছোট ছোট দলগুলোর কণ্ঠস্বরও শোনা যাবে। যা বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এটি জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রতিফলন ঘটাবে।
নতুন ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
যেকোনো বড় সংস্কারের মতো এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থারও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্লেষকরা কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন:
- আর্থিক চাপ: নতুন ১০০ জন সদস্যের বেতন-ভাতা, তাদের জন্য আলাদা কার্যালয়, আবাসন এবং প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বড় ধরণের আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব: যেহেতু প্রতিটি বিলকে দুটি কক্ষ পাড়ি দিতে হবে, তাই জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আইন পাশ করা ব্যাহত হতে পারে।
- রাজনৈতিক পুনর্বাসন: সমালোচকদের একটি বড় ভয় হলো, উচ্চকক্ষ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে পরাজিত ব্যক্তিদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ (Rehabilitation center) হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনে হেরে যাওয়া নেতাদের দলগুলো এখানে পদ দিয়ে ক্ষমতার অংশীদার করতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট
এই নতুন সংসদীয় কাঠামোটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার আগে জনগণের রায় নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত গণভোটে দেশের সাধারণ মানুষ এই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থার পক্ষে রায় দিয়েছে।তবে এর ব্যয়ভার ও কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও সংশয় দুই-ই রয়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী
সংসদের নিম্নকক্ষ বা জাতীয় সংসদ হলো সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভা। আর উচ্চকক্ষ হলো আনুপাতিক হারে মনোনীত সদস্যদের সভা যারা আইন পর্যালোচনার কাজ করেন।
উচ্চকক্ষের সদস্যদের মেয়াদ কত বছর?
নতুন নিয়মানুযায়ী উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ৪ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
উচ্চকক্ষ কি বাজেট আটকে দিতে পারে?
না, বাজেট এবং অর্থ সংক্রান্ত সব বিল পাশের চূড়ান্ত এবং একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল নিম্নকক্ষের হাতেই থাকবে।
উচ্চকক্ষে কি সংরক্ষিত নারী আসন থাকবে?
নিম্নকক্ষে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও উচ্চকক্ষে বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিধান রাখা হতে পারে।
পিআর মেথড (PR Method) কী?
এটি হলো ‘Proportional Representation’ বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব। এর মানে হলো একটি দল নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, উচ্চকক্ষে তারা সেই অনুপাতে সিট পাবে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের নতুন সংসদীয় কাঠামোটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা। সংসদের উচ্চকক্ষ নিম্নকক্ষ কী এবং এদের ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে কাজ করবে, তা আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদে উত্তরণ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে।



