ভোটার আইডি কার্ড পেতে কতদিন লাগে ২০২৬ (আপডেট তথ্য)

বাংলাদেশে একজন নাগরিকের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID Card একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ব্যাংক একাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে সরকারি যেকোনো সুযোগ-সুবিধা পেতে এর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে যারা নতুন ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করছেন, তাদের মনে একটিই প্রশ্ন—ছবি তোলার বা বায়োমেট্রিক দেওয়ার ঠিক কতদিন পর এনআইডি কার্ড হাতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন করছে, যার ফলে এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ভোটার আইডি কার্ড পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

সাধারনত, আপনি যদি সরাসরি উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে ভোটার নিবন্ধনের আবেদন করেন, তবে বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করার পর ২১ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপনার ভোটার আইডি কার্ড অনলাইনে চলে আসে। তবে যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তথ্য হালনাগাদ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে। একটি নতুন এনআইডি কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়াটি মূলত কয়েকটা ধাপে সম্পন্ন হয়। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত জানাব ভোটার আইডি কার্ড পেতে কতদিন লাগে এবং দ্রুত পাওয়ার উপায়গুলো কী কী।

আরও জেনে নিনঃ নতুন ভোটার হতে কি কি লাগে

ভোটার আইডি কার্ড পাওয়ার পর্যায়ক্রমিক ধাপসমূহ

একটি ভোটার আইডি কার্ড আবেদন করার পর তা হাতে পাওয়া পর্যন্ত বেশ কিছু অফিসিয়াল ধাপ অতিক্রম করতে হয়। নির্বাচন কমিশন আপনার দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করার পর সেটি ডাটাবেজে আপলোড করে। এই ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. তথ্য সংগ্রহ ও ফরম পূরণ

প্রথম ধাপে আপনাকে ভোটার নিবন্ধন ফরম ২ পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন—জন্ম নিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং বাবা-মায়ের এনআইডির কপি জমা দিতে হয়। এটি আপনি সরাসরি উপজেলা নির্বাচন অফিসে বা ঢাকা আগারগাঁও অফিসে জমা দিতে পারেন।

২. বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট

কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর আপনাকে একটি নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়া হবে ছবি তোলা এবং আঙ্গুলের ছাপ দেওয়ার জন্য। বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের সময় আপনার:

  • রঙিন ছবি তোলা হয়।
  • দশ আঙ্গুলের ছাপ নেওয়া হয়।
  • চোখের আইরিশ স্ক্যান করা হয়।
  • সবশেষে আপনাকে একটি ভোটার নিবন্ধন ফরমের অংশ বা স্লিপ (টোকেন) দেওয়া হয়। এটি অত্যন্ত যত্ন সহকারে রাখতে হবে কারণ এটি দিয়েই পরে কার্ড ডাউনলোড করতে হয়।

৩. ডাটা ভেরিফিকেশন ও আপলোড

আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা সেটি যাচাই করেন। যদি তথ্যে কোনো ভুল না থাকে, তবে তা এনআইডি সার্ভারে আপলোড করা হয়। এই ধাপটি সম্পন্ন হতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে।

ভোটার আইডি কার্ড পেতে কতদিন লাগে তার সঠিক সময়সীমা

অনেকেই জানতে চান নির্দিষ্টভাবে কত দিনের মাথায় কার্ডটি পাওয়া যাবে। কাজের ধরন অনুযায়ী সময় কম-বেশি হতে পারে। নিচে একটি ছকের মাধ্যমে সময়ের ধারণা দেওয়া হলো:

নিবন্ধনের ধরনসম্ভাব্য সময়সীমা
সরাসরি উপজেলা অফিসে আবেদন২১ থেকে ৩০ দিন
বাড়ি বাড়ি তথ্য হালনাগাদ কার্যক্রম৩ থেকে ৬ মাস
জরুরি বা বিশেষ আবেদন১৫ থেকে ২০ দিন
স্মার্ট কার্ড বিতরণনির্দিষ্ট সময়সীমা নেই (ইসির ঘোষণা সাপেক্ষে)

ছবি তোলার কতদিন পর এনআইডি কার্ড পাওয়া যায়?

বায়োমেট্রিক বা ছবি তোলার পর সাধারণত ২১ থেকে ৩০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। তবে অনেক সময় সার্ভারের কাজের চাপের কারণে এটি ৪০ দিন পর্যন্ত হতে পারে। আপনার আবেদনটি যদি সঠিকভাবে অনুমোদিত হয়, তবে আপনি আপনার মোবাইল ফোনে ১০৫ নম্বর থেকে একটি এসএমএস পাবেন। এসএমএস পাওয়ার পর আপনি অনলাইন থেকে আপনার এনআইডি কার্ডের কপি ডাউনলোড করতে পারবেন।

আরও জেনে নিনঃ NID সংশোধন করতে কত টাকা লাগে

বাড়ি বাড়ি ভোটার তথ্য হালনাগাদ বনাম সরাসরি আবেদন

নির্বাচন কমিশন মাঝেমধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে। এই পদ্ধতিতে সময় একটু বেশি লাগে কারণ এখানে বিশাল সংখ্যক মানুষের তথ্য একসাথে প্রসেস করা হয়।

তথ্য হালনাগাদের ৬টি প্রধান ধাপ:

১. তথ্য সংগ্রহ: তথ্যসংগ্রহকারী আপনার বাড়িতে গিয়ে প্রাথমিক তথ্য ফরম পূরণ করবেন।

২. ফরম পুনঃযাচাইকরণ: সুপারভাইজার আপনার তথ্যগুলো পুনরায় চেক করবেন।

৩. নিবন্ধন কেন্দ্রে বায়োমেট্রিক: নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে হয়।

৪. বিশেষ ভোটারদের নিবন্ধন: অসুস্থ, প্রতিবন্ধী বা জেলখানায় থাকা ভোটারদের আলাদাভাবে নিবন্ধন করা।

৫. উপজেলা সার্ভারে প্রসেসিং: সব তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে এন্ট্রি করা।

৬. খসড়া তালিকা প্রকাশ: চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয় যাতে কেউ ভুল থাকলে সংশোধন করতে পারে।

স্মার্ট কার্ড পেতে কতদিন লাগে?

বর্তমানে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সাধারণ লেমিনেটিং করা কার্ডের পরিবর্তে চিপযুক্ত স্মার্ট কার্ড প্রদান করছে। তবে মনে রাখবেন, নতুন ভোটার হওয়ার সাথে সাথেই স্মার্ট কার্ড পাওয়া যায় না। স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ ও বিতরণ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া।

নির্বাচন কমিশন যখন এলাকাভিত্তিক স্মার্ট কার্ড বিতরণের ঘোষণা দেয়, কেবল তখনই সেটি সংগ্রহ করা যায়। বর্তমানে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যারা ভোটার হয়েছেন, তাদের স্মার্ট কার্ড বিতরণের কাজ পর্যায়ক্রমে চলছে। তবে যারা দ্রুত এনআইডি ব্যবহার করতে চান, তারা অনলাইন থেকে সাধারণ এনআইডি কপি ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারেন। এর কার্যকারিতা স্মার্ট কার্ডের মতোই।

অনলাইন থেকে এনআইডি কার্ড ডাউনলোড করার নিয়ম

ভোটার আইডি কার্ড অনলাইনে চলে আসলে আপনি খুব সহজেই তা ডাউনলোড করতে পারেন। এর জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করুন:

১. রেজিস্ট্রেশন: এনআইডি সার্ভিসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার ফরম নম্বর বা এনআইডি নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিয়ে সাইন আপ করুন।

২. ফেস ভেরিফিকেশন: এনআইডি ওয়ালেট অ্যাপের মাধ্যমে আপনার ফেস ভেরিফাই করুন।

৩. পাসওয়ার্ড সেট: আপনার অ্যাকাউন্টের জন্য একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড সেট করুন।

৪. ডাউনলোড: প্রোফাইলে প্রবেশ করে ‘ডাউনলোড’ বাটনে ক্লিক করলে আপনার এনআইডি কার্ডের পিডিএফ কপি ডাউনলোড হয়ে যাবে।

এনআইডি কার্ড পেতে দেরি হওয়ার কারণসমূহ

কখনো কখনো ৩০ দিন পার হয়ে গেলেও কার্ড অনলাইনে পাওয়া যায় না। এর কিছু সাধারণ কারণ হতে পারে:

  • তথ্যাদি ভুল থাকা: আপনার দেওয়া তথ্যের সাথে বাবা-মায়ের তথ্যের মিল না থাকলে ফাইল আটকে যেতে পারে।
  • ডুপ্লিকেট ভোটার: আপনি যদি আগে কখনো ভোটার হয়ে থাকেন এবং পুনরায় আবেদন করেন, তবে আপনার আবেদন বাতিল বা স্থগিত হতে পারে।
  • সার্ভার জটিলতা: মাঝেমধ্যে ইসির মেইন সার্ভারে কারিগরি সমস্যার কারণে ডাটা আপডেট হতে সময় লাগে।
  • এলাকাভিত্তিক জট: বড় বড় শহরে ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রসেসিংয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে।

প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)

আমি ভোটার হওয়ার ১৫ দিন হয়ে গেছে কিন্তু এসএমএস পাইনি, কেন?

সাধারণত ২১ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। দয়া করে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করুন অথবা ১০৫ নম্বরে কল করে আপনার আবেদনের বর্তমান অবস্থা জানুন।

অনলাইন কপি কি সব কাজে ব্যবহার করা যাবে?

হ্যাঁ, অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা এনআইডি কার্ডের কপিটি লেমিনেটিং করে আপনি ব্যাংক একাউন্ট, সিম কার্ড ক্রয় এবং সরকারি সকল কাজে ব্যবহার করতে পারবেন।

ভোটার স্লিপ বা টোকেন হারিয়ে গেলে কি কার্ড পাওয়া যাবে?

হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে আপনাকে থানায় একটি জিডি করতে হবে এবং জিডি কপি নিয়ে উপজেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করলে তারা আপনাকে এনআইডি নম্বর সরবরাহ করবে।

স্মার্ট কার্ড পেতে কি কোনো টাকা লাগে?

নতুন ভোটারদের জন্য প্রথমবার স্মার্ট কার্ড সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। তবে কার্ড হারিয়ে ফেললে বা সংশোধন করলে নির্দিষ্ট ফি জমা দিতে হয়।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, ভোটার আইডি কার্ড পেতে কতদিন লাগে তা নির্ভর করে আপনি কোন পদ্ধতিতে আবেদন করছেন তার ওপর। ব্যক্তিগতভাবে উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবেদন করলে ৩০ দিনের মধ্যেই এনআইডি পাওয়া সম্ভব। স্মার্ট কার্ড পেতে দেরি হলেও অনলাইন কপি আপনার জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। তাই ধৈর্য ধরে ইসির মেসেজের জন্য অপেক্ষা করুন এবং নিয়মিত এনআইডি পোর্টালে আপনার আবেদনের স্ট্যাটাস চেক করুন। ডিজিটাল বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এনআইডি কার্ড আপনার অন্যতম অধিকার, যা আপনার জাতীয় পরিচয় নিশ্চিত করে।

অন্যান্য পোস্টগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *