বাংলাদেশ থেকে অনেক মানুষ উন্নত জীবনের আশায় দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বিশেষ করে ২০২৬ সালে এসে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আপনি যদি একজন চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী কিংবা পর্যটক হিসেবে এই দেশটি ভ্রমণ করতে চান, তবে আপনার প্রথম প্রশ্ন হবে সাউথ কোরিয়া যেতে কত টাকা লাগে? দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ, যেখানে কাজের পরিবেশ এবং বেতন উভয়ই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার সঠিক খরচ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে।
Table of Contents
বাংলাদেশ থেকে সাউথ কোরিয়া যেতে কত টাকা লাগে ২০২৬
বাংলাদেশ থেকে সাউথ কোরিয়া যেতে কত টাকা লাগে তা মূলত নির্ভর করে আপনি কোন উপায়ে বা কোন ভিসায় যাচ্ছেন তার ওপর। সাধারণত সরকারিভাবে এবং বেসরকারিভাবে যাওয়ার খরচের মধ্যে বিশাল পার্থক্য থাকে।
সরকারিভাবে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার খরচ
বাংলাদেশ থেকে সরকারিভাবে বোয়েসেল (BOESL) এর মাধ্যমে ই-৯ (E-9) ভিসায় দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া সবচেয়ে সাশ্রয়ী। সরকারিভাবে সাউথ কোরিয়া যেতে কত টাকা লাগে তার একটি আনুমানিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
- কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা ও পরীক্ষা ফি: আনুমানিক ৩,০০০ – ৪,০০০ টাকা।
- পাসপোর্ট ও পুলিশ ভেরিফিকেশন: ৫,০০০ – ১০,০০০ টাকা।
- মেডিকেল চেকআপ ও কালার টেস্ট: ৪,০০০ – ৬,০০০ টাকা।
- বোয়েসেল সার্ভিস চার্জ ও বিমান ভাড়া: ৮০,০০০ – ১,২০,০০০ টাকা।
সব মিলিয়ে সরকারিভাবে যেতে আপনার খরচ হবে মাত্র ১ লাখ থেকে ১.৫ লাখ টাকার মতো। এটি সবচেয়ে নিরাপদ এবং বৈধ পদ্ধতি।
আরও জেনে নিনঃ ইউরোপ যেতে কত টাকা লাগে
বেসরকারিভাবে যাওয়ার খরচ
বেসরকারিভাবে বা এজেন্সির মাধ্যমে স্টুডেন্ট ভিসা কিংবা টুরিস্ট ভিসায় যাওয়ার খরচ অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দালাল চক্রের মাধ্যমে যেতে চাইলে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে আমরা সবসময় সরকারি মাধ্যম বা বৈধ স্টুডেন্ট ভিসায় যাওয়ার পরামর্শ দেই।
দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার খরচের তালিকা ২০২৬
নিচের ছকটি দেখলে আপনি বিভিন্ন খাতের খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন:
| খরচের খাত | আনুমানিক টাকার পরিমাণ (বিডিটি) |
| ভাষা পরীক্ষার আবেদন ফি | ৩,৫০০ – ৫,০০০ টাকা |
| স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Medical) | ৫,০০০ – ৭,০০০ টাকা |
| পুলিশ ক্লিয়ারেন্স | ৫০০ – ১,০০০ টাকা |
| বিমান টিকিট (একমুখী) | ৪৫,০০০ – ৭০,০০০ টাকা |
| ভিসা প্রসেসিং ও এজেন্সি ফি | ৫০,০০০ – ৫,০০,০০০+ টাকা |
| বিমা ও আনুষঙ্গিক | ১০,০০০ – ১৫,০০০ টাকা |
দক্ষিণ কোরিয়া যেতে কি কি লাগে?
একটি দেশের ভিসা পাওয়ার জন্য নথিপত্র বা ডকুমেন্টেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার জন্য আপনার নিচের কাগজপত্রগুলো অবশ্যই থাকতে হবে:
- পাসপোর্ট: ন্যূনতম ৬ মাস থেকে ১ বছর মেয়াদ থাকা ডিজিটাল পাসপোর্ট।
- ছবি: ল্যাব প্রিন্ট করা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড)।
- জাতীয় পরিচয়পত্র: ভোটার আইডি কার্ড বা জন্ম নিবন্ধন সনদ।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: ন্যূনতম এসএসসি বা সমমান পাসের সার্টিফিকেট।
- ভাষা দক্ষতার সনদ: EPS-TOPIK বা TOPIK পরীক্ষার সার্টিফিকেট (কাজের ভিসার জন্য বাধ্যতামূলক)।
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড নেই এমন সনদ।
- স্বাস্থ্য পরীক্ষা রিপোর্ট: যক্ষ্মা বা অন্য কোনো সংক্রামক রোগ নেই তার প্রমাণ।
- কালার ব্লাইন্ডনেস টেস্ট: রঙ চেনার ক্ষমতা আছে কি না তার রিপোর্ট।
- অভিজ্ঞতার সনদ: যদি বিশেষ কোনো টেকনিক্যাল কাজে দক্ষতা থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়া যেতে বয়স কত লাগে ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়া সরকার শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের বিষয়ে খুব কড়াকড়ি নিয়ম মেনে চলে। ২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী বয়সসীমা নিচে দেওয়া হলো:
- কাজের ভিসা (E-9): ১৮ বছর থেকে ৩৯ বছর পর্যন্ত। তবে সাধারণত ১৯ বছরের নিচে এবং ৩৯ বছরের বেশি বয়সীদের আবেদন গ্রহণ করা হয় না।
- স্টুডেন্ট ভিসা: ১৮ বছর থেকে ৩০ বছর (ভিসা ক্যাটাগরি ও কোর্সের ওপর ভিত্তি করে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে)।
- টুরিস্ট ভিসা: এক্ষেত্রে বয়সের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই, তবে অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা জরুরি।
আপনার বয়স যদি ১৯ থেকে ৩৯ এর মধ্যে হয় এবং আপনি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকেন, তবে আপনি দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার জন্য যোগ্য।
বাংলাদেশ থেকে সাউথ কোরিয়া যেতে কত সময় লাগে?
বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার যাত্রাটি বেশ দীর্ঘ। বাংলাদেশ টু সাউথ কোরিয়া দূরত্ব প্রায় ৩,৮২৭ কিলোমিটার। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কোনো সরাসরি ফ্লাইট নেই বললেই চলে। সাধারণত থাইল্যান্ড, চীন বা দুবাই হয়ে কানেক্টিং ফ্লাইটে যেতে হয়।
- সরাসরি ফ্লাইট (যদি থাকে): ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা।
- কানেক্টিং ফ্লাইট: ১৮ ঘণ্টা থেকে ২৬ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে (ট্রানজিট সময়ের ওপর ভিত্তি করে)।
ভিসা প্রসেসিং হতে কত সময় লাগে তা নির্ভর করে আপনার আবেদনের ওপর। সরকারিভাবে ই-৯ ভিসায় পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে দেশটিতে পৌঁছাতে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
বাংলাদেশ টু দক্ষিণ কোরিয়া বিমান ভাড়া কত ২০২৬
বিমানের ভাড়া সবসময় এক থাকে না। এটি সিজন এবং এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভর করে বাড়ে বা কমে। ২০২৬ সালের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী বিমান ভাড়ার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- ইকোনমি ক্লাস (One Way): ৪০,০০০ টাকা থেকে ৬৫,০০০ টাকা।
- বিজনেস ক্লাস: ১,২০,০০০ টাকা থেকে ২,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
সাধারণত টিকিট আগে থেকে বুক করলে কিছুটা কম দামে পাওয়া যায়। এছাড়া কোরিয়ান এয়ার, ক্যাথে প্যাসিফিক, বা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ভাড়া অন্যান্য লোকাল এয়ারলাইন্সের চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া কাজের বেতন এবং সুযোগ সুবিধা
সাউথ কোরিয়া যেতে কত টাকা লাগে জানার পাশাপাশি সেখানকার বেতন সম্পর্কে জানাও জরুরি। দক্ষিণ কোরিয়াতে বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি বা মিনিমাম ওয়েজ বেশ ভালো।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, একজন সাধারণ শ্রমিক মাসে প্রায় ১,৮০,০০০ থেকে ২,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। ওভারটাইম করলে এই আয় ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এছাড়া কোরিয়ান কোম্পানিগুলো আবাসন এবং খাবারের সুবিধা প্রদান করে থাকে। সরকারিভাবে গেলে আপনি বিমা এবং আইনি সব ধরনের নিরাপত্তা পাবেন।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQ)
সরকারিভাবে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার মাধ্যম কোনটি?
সরকারিভাবে যাওয়ার একমাত্র বৈধ মাধ্যম হলো বোয়েসেল (BOESL)। আপনি তাদের ওয়েবসাইট থেকে নিয়মিত সার্কুলার দেখে আবেদন করতে পারেন।
কোরিয়ান ভাষা না শিখলে কি কোরিয়া যাওয়া সম্ভব?
কাজের ভিসায় যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই EPS-TOPIK পরীক্ষায় পাস করতে হবে। ভাষা না শিখে বৈধভাবে কাজের ভিসায় যাওয়া অসম্ভব। তবে স্টুডেন্ট ভিসায় ইংরেজি জানা থাকলেও সুযোগ থাকে।
কোরিয়া যেতে কত টাকা লাগে স্টুডেন্ট ভিসায়?
স্টুডেন্ট ভিসায় টিউশন ফি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৫ লাখ থেকে ৮ লাখ টাকা লাগতে পারে। তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিংয়ের ওপর নির্ভর করে।
দক্ষিণ কোরিয়া যেতে শিক্ষাগত যোগ্যতা কত লাগে?
সরকারিভাবে যাওয়ার জন্য নূন্যতম এসএসসি বা সমমান পাস হতে হয়।
লটারি সিস্টেম কি এখনো আছে?
হ্যাঁ, দক্ষিণ কোরিয়া যেতে হলে প্রথমে লটারিতে নাম আসতে হয় (ইপিএস সিস্টেমের ক্ষেত্রে)। এরপর ভাষা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়।
শেষ কথা
দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় শ্রমবাজার। সঠিক তথ্য না জেনে বা দালালের খপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা নষ্ট করবেন না। আপনি যদি পরিশ্রমী হন এবং একটু কষ্ট করে কোরিয়ান ভাষা শিখতে পারেন, তবে সামান্য কিছু খরচে সরকারিভাবে দেশটিতে যেতে পারবেন। ২০২৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার দক্ষ জনবল নিতে আরও বেশি আগ্রহী। তাই নিজেকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলুন এবং সঠিক নিয়ম মেনে আবেদন করুন। আশা করি আজকের এই নিবন্ধ থেকে সাউথ কোরিয়া যেতে কত টাকা লাগে এবং যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছেন।





