নিউজ

এনইআইআর চালু, অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধে নতুন যুগে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য বড় একটি পরিবর্তন এসেছে। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার বা NEIR কার্যক্রম চালু করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করা, চুরি হওয়া ফোন শনাক্ত করা এবং দেশের মোবাইল বাজারে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী এখন থেকে দেশের নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া প্রতিটি নতুন হ্যান্ডসেট নির্দিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। ফলে গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারক সবার জন্যই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

NEIR ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রাহকের ব্যক্তিগত কল, মেসেজ বা ইন্টারনেট ব্যবহার নজরদারি করে না। এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে নেটওয়ার্ককে নিরাপদ রাখে। এই কারণে সাধারণ ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং এটি বৈধ ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য স্বস্তির খবর।

এনইআইআর কী এবং কেন চালু হলো

NEIR মূলত একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজভিত্তিক ব্যবস্থা। এখানে প্রতিটি মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর যাচাই করা হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে অবৈধভাবে আমদানি করা বা কর ফাঁকি দিয়ে আনা ফোনের সংখ্যা বেড়েছে। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, পাশাপাশি বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই এনইআইআর চালু করা হয়েছে।

বিটিআরসির মতে, অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধ করা গেলে গ্রাহকরা মানসম্মত সেবা পাবেন এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে চুরি হওয়া ফোন দ্রুত ব্লক করা সম্ভব হবে, যা অপরাধ দমনেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

এনইআইআর কীভাবে কাজ করে

কারিগরি দিক থেকে NEIR তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই করে—

আইএমইআই নম্বর যাচাই

প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি ইউনিক আইএমইআই নম্বর থাকে। এই নম্বরের মাধ্যমেই ফোনটির বৈধতা যাচাই করা হয়।

সিম নম্বর ও IMSI

সিম কার্ডের সঙ্গে যুক্ত আইএমএসআই নম্বরের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে ফোনটি কোন নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে।

স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন

ইতিমধ্যে যেসব ফোন দেশের নেটওয়ার্কে চালু ছিল, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনইআইআরে নিবন্ধিত হয়ে গেছে। এতে পুরোনো গ্রাহকদের আলাদা করে কোনো কাজ করতে হচ্ছে না। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো কল রেকর্ড হয় না, কোনো মেসেজ পড়া হয় না এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজরদারি করা হয় না।

ব্যবসায়ীদের জন্য সময়সীমা ও নিয়ম

মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে অবিক্রীত বা স্টকে থাকা ফোনের তথ্য জমা দেওয়ার সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিটিআরসি জানিয়েছে, যেসব ব্যবসায়ী সময়মতো আইএমইআই তালিকা জমা দিয়েছেন, তাঁদের ফোনগুলো বন্ধ হবে না।

এর ফলে বৈধভাবে আমদানি করা কিন্তু এখনো বিক্রি না হওয়া ফোনগুলো নিরাপদ থাকছে। এতে বাজারে হঠাৎ করে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমেছে।

আজ থেকে নতুন ফোনের ক্ষেত্রে কী হবে

আজ থেকে দেশের নেটওয়ার্কে নতুন চালু হওয়া ফোনগুলো NEIR যাচাইয়ের আওতায় আসবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন ফোন চালু হলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্লক করা হবে না। প্রথমে ফোনটির আইএমইআই যাচাই করা হবে। যদি এটি বৈধ হয়, তাহলে কোনো সমস্যা হবে না।

অবৈধ প্রমাণিত হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটি বন্ধ করা হবে। এতে গ্রাহকরা আগেভাগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধা

বিদেশ থেকে আসা প্রবাসীদের জন্যও এনইআইআর ব্যবস্থায় বিশেষ ছাড় রাখা হয়েছে। তাঁরা তাঁদের ব্যবহৃত ফোনের পাশাপাশি দুটি নতুন হ্যান্ডসেট দেশে আনতে পারবেন। এসব ফোন নিবন্ধনের জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হবে।

এই তিন মাস ফোনগুলো সচল থাকবে। ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখিয়ে সহজেই এনইআইআরে নিবন্ধন করা যাবে। ফলে প্রবাসীদের জন্য এটি বাড়তি ঝামেলার কারণ হবে না।

সাধারণ ব্যবহারকারীদের করণীয়

সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য এনইআইআর নিয়ে আলাদা করে কিছু করার প্রয়োজন নেই, যদি ফোনটি বৈধভাবে কেনা হয়ে থাকে। তবুও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—

বৈধ দোকান থেকে ফোন কেনা

সব সময় অনুমোদিত ও পরিচিত দোকান থেকে ফোন কেনা উচিত।

আইএমইআই মিলিয়ে দেখা

ফোন কেনার সময় বক্স ও ফোনের আইএমইআই নম্বর মিলিয়ে দেখা ভালো।

সন্দেহ হলে যাচাই

ফোনের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ হলে বিটিআরসির নির্ধারিত পদ্ধতিতে আইএমইআই যাচাই করা যেতে পারে।

বাজারে এর প্রভাব

এনইআইআর চালুর ফলে মোবাইল বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবৈধ ফোনের প্রবেশ কমে গেলে বৈধ আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। একই সঙ্গে গ্রাহকরা পাবেন মানসম্মত পণ্য ও সেবা। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বিটিআরসির বক্তব্য

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, এনইআইআর চালুর মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করা উদ্দেশ্য নয়। বরং একটি স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক মোবাইল বাজার গড়ে তোলাই লক্ষ্য। ব্যবসায়ীদের জমা দেওয়া আইএমইআই তালিকাভুক্ত ফোন এবং বৈধভাবে আনা হ্যান্ডসেট বন্ধ করা হবে না।

প্রশ্ন–উত্তর (FAQ)

এনইআইআর কি আমার ব্যক্তিগত তথ্য দেখবে?

না। এনইআইআর শুধু প্রযুক্তিগত শনাক্তকরণ তথ্য যাচাই করে, ব্যক্তিগত তথ্য নয়।

পুরোনো ফোন কি বন্ধ হয়ে যাবে?

না। যেসব ফোন আগে থেকেই নেটওয়ার্কে চালু ছিল, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত।

বিদেশ থেকে আনা ফোন কি ব্যবহার করা যাবে?

হ্যাঁ। প্রবাসীরা তিন মাস সময় পাবেন নিবন্ধনের জন্য।

অবৈধ ফোন ধরা পড়লে কী হবে?

যাচাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী ফোনটি বন্ধ করা হবে।

শেষ কথা

এনইআইআর চালু হওয়া বাংলাদেশের মোবাইল খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি অবৈধ ফোন ব্যবহার কমাবে, চুরি হওয়া ফোন শনাক্তে সহায়তা করবে এবং বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এতে তেমন কোনো ঝামেলা নেই, বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি সবার জন্যই উপকারী হবে। বৈধ ফোন ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button