গণভোট ২০২৬: হ্যাঁ না ভোট কি এবং সংবিধানে যেসব বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। এই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে একটি ঐতিহাসিক গণভোট। সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন হলো হ্যাঁ না ভোট কি এবং কেন এই ভোটের আয়োজন করা হয়েছে? সহজ কথায়, গণভোট হলো রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি জনগণের মতামত গ্রহণ করা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করেছে, যেখানে সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ভোটাররা ব্যালটে দেওয়া নির্দিষ্ট প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিয়ে জানাবেন যে তারা এই সংস্কারগুলোর পক্ষে নাকি বিপক্ষে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই গণভোটকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার সোপান হিসেবে অভিহিত করেছে। যদি এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তবে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো থেকে শুরু করে শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। আর যদি ‘না’ জয়ী হয়, তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এই আর্টিকেলে আমরা হ্যাঁ না ভোট কি তার গভীর বিশ্লেষণসহ সংবিধানে সম্ভাব্য সকল পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করব।
জুলাই সনদ এবং গণভোটের প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর দেশ সংস্কারের যে দাবি উঠেছিল, তাকে একটি আইনি ও সাংবিধানিক রূপ দিতেই এই ‘জুলাই সনদ’ তৈরি করা হয়েছে। সংস্কার কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধান সংশোধনের সাথে যুক্ত এবং বাকি ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, তাই সরকার সরাসরি জনগণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হ্যাঁ না ভোট কি তা বুঝতে হলে এই ৮৪টি প্রস্তাবের গুরুত্ব বোঝা জরুরি।
ভাষা, জাতি ও পরিচয়গত পরিবর্তন
বিদ্যমান সংবিধানে জাতীয় পরিচয় এবং ভাষার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী এই জায়গাগুলোতে বড় পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে:
- রাষ্ট্রভাষা ও মাতৃভাষা: বর্তমান সংবিধানে কেবল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বলা হলেও অন্য ভাষার স্বীকৃতি নেই। নতুন প্রস্তাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা রেখে অন্য সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
- জাতীয় পরিচয়: বাংলাদেশের নাগরিকরা এতদিন ‘বাঙালি জাতি’ হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কারের পর তাদের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’। এটি একটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
- মূলনীতি: বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ। তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তনের পর মূলনীতি হবে— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে একক ক্ষমতা থাকার বিষয়টি নিয়ে সবসময়ই সমালোচনা হয়েছে। হ্যাঁ না ভোট কি তা বোঝার ক্ষেত্রে ক্ষমতার এই ভারসাম্য পরিবর্তন অন্যতম প্রধান পয়েন্ট।
১. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা: বর্তমানে একজন ব্যক্তি কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন তার কোনো সীমা নেই। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি তার জীবনে ১০ বছরের বেশি বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
২. রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ক্ষমতা: বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতি প্রায় প্রতিটি কাজে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে বাধ্য থাকেন। নতুন নিয়মে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন এবং আইন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানদের নিয়োগ দিতে পারবেন।
৩. জরুরি অবস্থা জারি: আগে কেবল প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে জরুরি অবস্থা জারি করা যেত। নতুন নিয়মে মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সংসদ ও নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে বাংলাদেশের সংসদীয় কাঠামোতে অভাবনীয় পরিবর্তন আসবে। এতদিন বাংলাদেশ এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের দেশ হলেও এখন দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
- উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ: সংসদে একটি উচ্চকক্ষ থাকবে যার সদস্য সংখ্যা হবে ১০০। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে যে অনুপাতে ভোট পাবে, সেই আনুপাতিক হারেই উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে।
- নারীদের সংরক্ষিত আসন: বর্তমানে সংসদে নারীদের ৫০টি সংরক্ষিত আসন থাকলেও তা ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- এমপিদের স্বাধীন ভোটদান: বর্তমান ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে পদ হারান। নতুন প্রস্তাবে বাজেট ও আস্থা বিল ছাড়া অন্য সব বিষয়ে এমপিদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সংবিধানে স্থায়ীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ কাঠামোর অধীনে হয়।
বিচার বিভাগ ও আইন ব্যবস্থা সংস্কার
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে বেশ কিছু কঠোর পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. বিচারক নিয়োগ কমিশন: হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ আগে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন তা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন কমিশনের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
২. ন্যায়পাল নিয়োগ: সংবিধানে থাকলেও দীর্ঘকাল যাবৎ ন্যায়পাল নিয়োগ হয়নি। এবার স্পিকারের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
৩. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল: উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ বা তদারকির জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
বর্তমান বনাম প্রস্তাবিত সংবিধান: একনজরে পার্থক্য
| বিষয় | বর্তমান সংবিধান | প্রস্তাবিত জুলাই সনদ (হ্যাঁ জয়ী হলে) |
| প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ | নির্দিষ্ট নয় | সর্বোচ্চ ১০ বছর (২ মেয়াদ) |
| সংসদীয় কাঠামো | এক কক্ষ বিশিষ্ট | দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট (উচ্চকক্ষ ১০০ আসন) |
| জাতীয় পরিচয় | বাঙালি | বাংলাদেশি |
| নির্বাচনকালীন সরকার | দলীয় সরকার | নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার |
| মৌলিক অধিকার | ২২টি | ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা যুক্ত হবে |
| স্পিকার/ডেপুটি স্পিকার | উভয়ই সরকারি দল থেকে | ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে |
গণভোটের চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন
ভোটাররা ব্যালট পেপারে বড় ৮৪টি প্রস্তাব পাবেন না। সেখানে মাত্র চারটি পয়েন্ট থাকবে যার ওপর ভিত্তি করে তাদের রায় দিতে হবে। মূলত এই চারটি পয়েন্টের মাধ্যমে পুরো জুলাই সনদকে সমর্থন জানানো হবে। এই সংক্ষিপ্ত পয়েন্টগুলোর কারণেই সাধারণ মানুষের জানা দরকার হ্যাঁ না ভোট কি এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কী।
আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার (৩৭টি বিষয়)
সংবিধানের ৪৭টি সংস্কারের পাশাপাশি আরও ৩৭টি বিষয় আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন।
- একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন।
- বিচারক ও সরকারি কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
- স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন।
প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQs)
হ্যাঁ না ভোট কি এবং কেন এটি ১২ই ফেব্রুয়ারি হচ্ছে?
এটি একটি গণভোট যেখানে ভোটাররা সংবিধানের আমূল সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় দেবেন। নির্বাচনের দিনেই এটি আয়োজন করা হয়েছে যাতে খরচ এবং সময় সাশ্রয় হয় এবং সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে কী হবে?
যদি ‘না’ জয়ী হয়, তবে সরকার প্রস্তাবিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে আইনত বাধ্য থাকবে না। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হবে এবং নতুন সংসদ তাদের সিদ্ধান্ত নেবে।
একজন ব্যক্তি কি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন?
জুলাই সনদ কার্যকর হলে কোনো ব্যক্তি জীবনে দুইবারের বেশি বা ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
উচ্চকক্ষ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি সংসদের দ্বিতীয় স্তর। যেখানে মূলত বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে আসবেন, যা সংসদের ভারসাম্য রক্ষা করবে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। হ্যাঁ না ভোট কি তা সঠিকভাবে জানা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। জুলাই সনদ যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ১২ই ফেব্রুয়ারি জনগণের রায়ের ওপর। ভোটারদের রায় যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে আমরা একটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ নতুন এক বাংলাদেশের সাক্ষী হতে যাচ্ছি।






