বাংলাদেশের সরকারি চাকরির বাজারে ১৬তম গ্রেডের পদগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় একটি পদ হলো কার্য সহকারী (Work Assistant)। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা LGED-এ এই পদের বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আসার পর চাকরিপ্রার্থীদের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— প্রতিটি সরকারি অফিসে কার্য সহকারীর কাজ কি কি থাকে? অনেকে মনে করেন এটি কেবল দাপ্তরিক কাজ, আবার অনেকের ধারণা এটি সরাসরি মাঠ পর্যায়ের তদারকি। মূলত একজন কার্য সহকারীকে প্রশাসনিক ও কারিগরি উভয় ধরণের কাজে সহায়তা করতে হয়। আজকের এই নিবন্ধে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় একজন কার্য সহকারীর দৈনন্দিন কাজ, দায়িত্ব এবং দাপ্তরিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব।
কার্য সহকারী পদের ধরণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া
কার্য সহকারী পদটি সাধারণত সরকারের ৩য় শ্রেণির একটি পদ। এই পদের বেতন কাঠামো জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ১৬তম গ্রেডে পড়ে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে সাধারণত এইচএসসি (HSC) পাস চাওয়া হয়। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানভেদে এই যোগ্যতার কিছুটা তারতম্য হতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এর মিশন ও ভিশন বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে এই পদের কর্মীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রতিটি সরকারি অফিসে কার্য সহকারীর কাজ কি কি থাকে: মূল দায়িত্বসমূহ
সরকারি অফিসের কাঠামো অনুযায়ী একজন কার্য সহকারীর কাজ বহুমুখী হয়ে থাকে। নিচে প্রধান কাজগুলো পয়েন্ট আকারে আলোচনা করা হলো:
১. নথি ও ফাইল সংরক্ষণ (File Management)
অফিসের দৈনন্দিন কাজে যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বা নথি ব্যবহৃত হয়, তা সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখা এবং সংরক্ষণ করা কার্য সহকারীর প্রধান দায়িত্ব। কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে দ্রুত সঠিক ফাইলটি খুঁজে বের করা এবং ফাইলে নোটশিট বা চিঠিপত্র যথাযথভাবে স্থাপন করা তার কাজের অন্তর্ভুক্ত।
২. চিঠি ড্রাফটিং ও টাইপিং
মন্ত্রণালয় বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি প্রেরণ করতে হয়। এই চিঠির প্রাথমিক খসড়া বা ড্রাফট তৈরি করা এবং কর্মকর্তাদের সংশোধনী অনুযায়ী নির্ভুলভাবে কম্পিউটার টাইপ করা একজন কার্য সহকারীর অন্যতম কাজ।
৩. রেজিস্টার মেইনটেইন করা
সরকারি অফিসে বিভিন্ন ধরণের তথ্য সংরক্ষণের জন্য আলাদা আলাদা রেজিস্টার থাকে। প্রতিটি সরকারি অফিসে কার্য সহকারীর কাজ কি কি থাকে তা বুঝতে হলে রেজিস্টার মেইনটেইন করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। যেমন:
- ইনওয়ার্ড ও আউটওয়ার্ড রেজিস্টার: অফিসে আসা এবং অফিস থেকে যাওয়া চিঠির হিসাব।
- সম্পদ রেজিস্টার: অফিসের আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জামের হিসাব।
- ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী রেজিস্টার: কম্পিউটার, প্রিন্টার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির রেকর্ড।
৪. প্রশাসনিক কাজে সহায়তা
ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীদের দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজে সহায়তা করা কার্য সহকারীর দায়িত্ব। এর মধ্যে মিটিংয়ের নোটিশ তৈরি করা, হাজিরা খাতা রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং অফিসের ছোটখাটো কেনাকাটার ভাউচার সংরক্ষণ করা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (LGED) কার্য সহকারীর কাজ
এলজিইডি (LGED) একটি বিশাল প্রকৌশল সংস্থা। এখানে কার্য সহকারীর কাজ অন্যান্য সাধারণ অফিসের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন ও টেকনিক্যাল হতে পারে। নিচে এলজিইডিতে এই পদের বিশেষ কাজগুলো উল্লেখ করা হলো:
ক. সাইট সুপারভিশন বা মাঠ তদারকি
যদিও এটি মূলত একটি দাপ্তরিক পদ, তবে এলজিইডির অনেক প্রকল্পে কার্য সহকারীকে সাইটে গিয়ে কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হয়। রাস্তার কাজ বা ভবনের নির্মাণ কাজে ঠিকাদাররা নির্দিষ্ট নিয়ম মানছেন কি না, তা কর্মকর্তাদের অবহিত করা তাদের কাজের অংশ।
খ. বেতন বিল তৈরিতে সহায়তা
অফিসের অন্যান্য কর্মচারীদের বেতন বিল ও অন্যান্য ভাতা সংক্রান্ত কাগজ তৈরিতে হিসাব রক্ষণ শাখাকে সহায়তা প্রদান করা কার্য সহকারীর নিয়মিত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
গ. প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কাজের রেজিস্টার
এলজিইডিতে বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরণের ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চলে। এই প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য এবং অংশগ্রহণকারীদের তালিকা ও রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণ করা এই পদের অন্যতম কাজ।
কার্য সহকারী পদের গুরুত্ব ও মর্যাদা
১৬তম গ্রেডের পদ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি ব্যবস্থায় কার্য সহকারী পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন কার্য সহকারীই অফিসের মূল নথিপত্র বা “Backbone” সামলান। কর্মকর্তাদের আদেশ-নির্দেশ যখন মাঠ পর্যায়ে যায়, তখন তার সঠিক নথিবদ্ধ করার কাজ সম্পন্ন করেন এই কর্মীরাই। বর্তমানে ডিজিটাল অফিস ব্যবস্থাপনায় কম্পিউটার টাইপিং এবং অনলাইন ডাটা এন্ট্রি করার দক্ষতা একজন কার্য সহকারীর জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যান্য সরকারি দপ্তরের সাথে এলজিইডির কাজের পার্থক্য
সাধারণ প্রশাসনিক অফিসে কার্য সহকারীকে মূলত ডেস্ক জব বা টেবিল ওয়ার্ক করতে হয়। কিন্তু এলজিইডি, পিডব্লিউডি (PWD) বা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মতো টেকনিক্যাল দপ্তরগুলোতে তাদের কাজের পরিধি মাঠ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে সব ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য থাকে দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাজের ভার লাঘব করা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
কার্য সহকারী পদের বেতন স্কেল কত?
কার্য সহকারী পদটি জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী ১৬তম গ্রেডের। এর মূল বেতন ৯,৩০০ টাকা থেকে শুরু করে ২২,৪৯০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে, সাথে অন্যান্য সরকারি ভাতা যুক্ত হয়।
এই পদে আবেদনের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা কী লাগে?
সাধারণত এইচএসসি (HSC) বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা এই পদে আবেদন করতে পারেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করা প্রার্থীদের অনেক সময় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
কার্য সহকারী পদে পদোন্নতির সুযোগ কেমন?
নির্দিষ্ট সময় পর এবং বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে উচ্চতর গ্রেডে বা উচ্চতর পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।
কার্য সহকারী কি কেবল অফিসেই কাজ করেন?
না, অফিসের পাশাপাশি প্রয়োজনভেদে মাঠ পর্যায়ের কাজের তদারকি বা বিভিন্ন সরকারি মালামাল সরবরাহের দায়িত্বও তাদের পালন করতে হতে পারে।
এলজিইডিতে কার্য সহকারী পদের কাজ কি কঠিন?
এলজিইডির কাজের পরিধি অনেক বড়, তাই কাজের চাপ কিছুটা বেশি থাকতে পারে। তবে কাজগুলো যথাযথভাবে শিখলে এটি একটি বেশ সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় পেশা।
আরও আপনার প্রয়জনে জানুনঃ সরকারি অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের কাজ কি
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, প্রতিটি সরকারি অফিসে কার্য সহকারীর কাজ কি কি থাকে তা নির্ভর করে সেই দপ্তরের ধরণের ওপর। তবে মূল ভিত্তি হলো নথিপত্র ব্যবস্থাপনা, চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং প্রশাসনিক সহায়তা। বিশেষ করে এলজিইডির অধীনে কার্য সহকারী হিসেবে যোগদান করলে মাঠ পর্যায়ের উন্নয়নের সাক্ষী হওয়া সম্ভব। যারা স্বচ্ছ ও গোছানো কাজ করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য সরকারি কার্য সহকারী পদটি একটি চমৎকার ক্যারিয়ার অপশন হতে পারে। সঠিক দক্ষতা এবং দায়িত্ববোধ থাকলে এই পদে থেকে দেশ সেবার পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।