গ্রিস যেতে কত টাকা লাগে ২০২৬ (সর্বশেষ আপডেট)

ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমানো বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন। বিশেষ করে সেনজেনভুক্ত দেশ হওয়ায় গ্রিসের প্রতি আগ্রহ সবারই একটু বেশি। গ্রিস দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং শিল্পোন্নত দেশ। যারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চান এবং উন্নত জীবনের আশা করেন, তাদের জন্য গ্রিস একটি চমৎকার গন্তব্য হতে পারে। তবে ইউরোপের এই দেশে যাওয়ার আগে সবার মনেই প্রথম প্রশ্ন জাগে, গ্রিস যেতে কত টাকা লাগে ২০২৬ সালে? আজকের এই আর্টিকেলে আমরা গ্রিস ভিসা খরচ, আবেদনের নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

যারা বাংলাদেশ থেকে কাজের ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা বা টুরিস্ট ভিসা নিয়ে গ্রিস যেতে চান, তাদের জন্য সঠিক তথ্য জানা খুবই জরুরি। দালাল বা এজেন্সির খপ্পরে না পড়ে সঠিক নিয়ম ও খরচ সম্পর্কে ধারণা থাকলে আপনি প্রতারণা থেকে বাঁচতে পারবেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক গ্রিস যাওয়ার বর্তমান খরচ এবং আনুষঙ্গিক সব তথ্য।

গ্রিস যেতে কত টাকা লাগে?

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়া অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা কঠিন এবং ব্যয়সাপেক্ষ। তবে সঠিক মাধ্যম এবং যোগ্যতা থাকলে এই প্রক্রিয়াটি সহজ করা সম্ভব। গ্রিসে যাওয়ার খরচ মূলত নির্ভর করে আপনি কোন ভিসায় যাচ্ছেন এবং কোন মাধ্যমে (সরকারি না বেসরকারি) আবেদন করছেন তার ওপর।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে গ্রিস যেতে সাধারণত ৮ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে এই খরচটি মূলত কাজের ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সরকারিভাবে বা বোয়েসেল-এর মাধ্যমে যেতে পারলে খরচ অনেক কমে আসে, যা সাধারণত ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। কিন্তু বেসরকারি এজেন্সি বা মাধ্যম ধরলে খরচ বেড়ে যায়। নিচে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে গ্রিস যাওয়ার সম্ভাব্য খরচের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

গ্রিস ভিসা খরচের তালিকা (আনুমানিক)

ভিসার ধরনসরকারি খরচ (আনুমানিক)বেসরকারি/এজেন্সি খরচ (আনুমানিক)
ওয়ার্ক পারমিট ভিসা৪,০০,০০০ – ৫,০০,০০০ টাকা৮,০০,০০০ – ১২,০০,০০০ টাকা
স্টুডেন্ট ভিসা৩,৫০,০০০ – ৫,০০,০০০ টাকা৫,০০,০০০ – ৬,০০,০০০ টাকা
টুরিস্ট ভিসা৩,০০,০০০ – ৪,০০,০০০ টাকা৪,০০,০০০ – ৫,০০,০০০ টাকা

বিঃদ্রঃ টাকার এই পরিমাণ সময়ের সাথে পরিবর্তন হতে পারে। ইউরো রেট এবং বিমান ভাড়ার ওপর ভিত্তি করে মোট খরচের কম-বেশি হওয়া স্বাভাবিক।

গ্রিস ভিসা আবেদনের ধরণ ও সুযোগ-সুবিধা

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ হওয়ায় গ্রিসের মুদ্রার মান অনেক শক্তিশালী। বর্তমানে ১ ইউরো সমান বাংলাদেশের প্রায় ১২৬ টাকা। তাই সেখানে কাজের সর্বনিম্ন বেতনও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশ থেকে যারা গ্রিসে যান, তারা মূলত কৃষি কাজ, রেস্টুরেন্ট, কনস্ট্রাকশন এবং বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে কাজের সুযোগ পান।

স্টুডেন্ট ভিসায় গ্রিস

শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রিস একটি দারুণ গন্তব্য হতে পারে। স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে গেলে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ করার সুযোগ থাকে। এতে করে নিজের খরচ নিজেই চালানো সম্ভব হয়। স্টুডেন্ট ভিসার খরচ ওয়ার্ক ভিসার তুলনায় অনেক কম। সাধারণত ৪ থেকে ৬ লাখ টাকার মধ্যে স্টুডেন্ট ভিসায় গ্রিস যাওয়া সম্ভব। তবে এর জন্য ভাষা দক্ষতা (IELTS) এবং ভালো একাডেমিক রেজাল্ট থাকা জরুরি।

টুরিস্ট ভিসা

যারা শুধুমাত্র ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গ্রিস যেতে চান, তাদের জন্য টুরিস্ট ভিসা উপযুক্ত। এই ভিসার খরচ ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার মতো হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে কাজ করা অবৈধ এবং এটি অনেক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

গ্রিস ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া

আপনি যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে গ্রিস যাবেন, তবে ভিসা আবেদনের সঠিক প্রক্রিয়াটি জানা আবশ্যক। বাংলাদেশ থেকে স্টুডেন্ট, টুরিস্ট বা কাজের ভিসা—যেটাই হোক না কেন, নিয়ম মেনে আবেদন করলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

  • ১. অনলাইন আবেদন: প্রথমে গ্রিসের অফিসিয়াল ইমিগ্রেশন ওয়েবসাইটে গিয়ে ভিসা আবেদন ফরম ডাউনলোড করতে হবে। সেখানে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে ফরমটি নির্ভুলভাবে পূরণ করতে হবে।
  • ২. কাগজপত্র প্রস্তুতকরণ: আপনার ভিসার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে।
  • ৩. অ্যাপয়েন্টমেন্ট গ্রহণ: অনলাইনে ফরম পূরণের পর বাংলাদেশে অবস্থিত গ্রিস দূতাবাসে ফাইল জমা এবং বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও ছবি) দেওয়ার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
  • ৪. সাক্ষাৎকার: নির্ধারিত তারিখে দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে ভিসা অফিসারের মুখোমুখি হতে হবে এবং ইন্টারভিউ দিতে হবে।
  • ৫. ফি জমা: ভিসা প্রসেসিং ফি এবং আনুষঙ্গিক খরচ জমা দিয়ে রশিদ সংগ্রহ করতে হবে।

গ্রিস যেতে কি কি লাগে? (প্রয়োজনীয় কাগজপত্র)

ভিসা প্রসেসিংয়ের সময় কাগজের ঘাটতি থাকলে ভিসা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আগে থেকেই নিচের তালিকা অনুযায়ী সব ডকুমেন্ট প্রস্তুত রাখা ভালো। ভিসা ক্যাটাগরি ভেদে কাগজপত্রের ভিন্নতা থাকতে পারে, তবে সাধারণ যা যা লাগে তা নিচে দেওয়া হলো:

  • বৈধ পাসপোর্ট: পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ৬ মাস থাকতে হবে।
  • ছবি: সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ল্যাব প্রিন্ট ছবি।
  • জাতীয় পরিচয় পত্র (NID): মূল কপি এবং ফটোকপি।
  • ভাষা দক্ষতার প্রমাণপত্র: স্টুডেন্ট বা কিছু ক্ষেত্রে ওয়ার্ক ভিসার জন্য IELTS, GRE বা TOFEL স্কোর লাগতে পারে।
  • শিক্ষাগত যোগ্যতা: সকল একাডেমিক সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপ্ট (স্টুডেন্ট ও কাজের ভিসার জন্য)।
  • কাজের অভিজ্ঞতা: ওয়ার্ক পারমিট ভিসার জন্য সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট (Experience Certificate)।
  • পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: আপনার নামে কোনো মামলা নেই মর্মে পুলিশ ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট।
  • মেডিকেল রিপোর্ট: আপনি শারীরিকভাবে সুস্থ কি না তার মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট।
  • ব্যাংক সলভেন্সি: ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রমাণ।
  • অফার লেটার: স্টুডেন্টদের জন্য ইউনিভার্সিটি অফার লেটার এবং কর্মীদের জন্য জব অফার লেটার।

গ্রিস যাওয়ার বয়সসীমা

অনেকেই জানতে চান গ্রিস যেতে কত বছর বয়স লাগে। ইউরোপের দেশগুলোতে কাজের জন্য বয়সের একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। বাংলাদেশ থেকে যারা কাজের ভিসা নিয়ে যেতে চান, তাদের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। এর কম বয়সে সাধারণত ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া যায় না।

অন্যদিকে, যারা পড়াশোনার জন্য স্টুডেন্ট ভিসায় যেতে চান অথবা ভ্রমণের জন্য টুরিস্ট ভিসায় আবেদন করবেন, তাদের বয়স ন্যূনতম ১৮ বছর হতে হবে। ১৮ বছরের নিচে হলে অভিভাবকের সম্মতিপত্র এবং বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে।

দালাল বা এজেন্সির ব্যাপারে সতর্কতা

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রতারণা। সরকারিভাবে যাওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিই সবচেয়ে নিরাপদ এবং সাশ্রয়ী। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বোয়েসেল (BOESL) বা বিএমইটি (BMET)-এর মাধ্যমে চেষ্টা করা উচিত।

যদি বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে যেতে চান, তবে অবশ্যই সেই এজেন্সির লাইসেন্স আছে কি না এবং তাদের অতীত রেকর্ড ভালো কি না তা যাচাই করে নেবেন। অযথা অতিরিক্ত টাকা লেনদেন করবেন না এবং ভিসা হাতে পাওয়ার আগে বড় অংকের টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন, গ্রিস যেতে কত টাকা লাগে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি সঠিক উপায়ে এবং নিরাপদে পৌঁছাতে পারছেন কি না।

শেষ কথা

গ্রিস একটি সমৃদ্ধ ও সুন্দর দেশ, যেখানে ক্যারিয়ার গড়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে গ্রিস যাওয়ার খরচ কিছুটা বাড়লেও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আপনি যদি দক্ষ হন এবং সঠিক কাগজপত্র থাকে, তবে সরকারি বা বিশ্বস্ত এজেন্সির মাধ্যমে সহজেই আপনার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন। তাড়াহুড়ো না করে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন এবং প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকুন। আপনার বিদেশ যাত্রা সফল ও নিরাপদ হোক।

প্রশ্ন-উত্তর (FAQs)

বাংলাদেশে গ্রিসের এম্বাসি কোথায় অবস্থিত?

বাংলাদেশে গ্রিসের এম্বাসি ঢাকার গুলশানে অবস্থিত। এর পূর্ণ ঠিকানা: ৫১/বি, বোরাক মেহনুর, ঢাকা ১২১২। ভিসা সংক্রান্ত সব কাজের জন্য এখানেই যোগাযোগ করতে হয়।

গ্রিস কি সেনজেন ভুক্ত দেশ?

হ্যাঁ, গ্রিস ইউরোপের সেনজেনভুক্ত (Schengen Area) একটি দেশ। এর মানে হলো, আপনি গ্রিসের ভিসা পেলে ইউরোপের অন্যান্য সেনজেনভুক্ত দেশেও সহজে ভ্রমণ করতে পারবেন।

বাংলাদেশ থেকে গ্রিস কিভাবে যাওয়া যায়?

আপনি সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন—প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বোয়েসেল, বিএমইটি-এর মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন। এছাড়া সরকার অনুমোদিত বেসরকারি এজেন্সি বা ভিএফএস গ্লোবাল (VFS Global)-এর মাধ্যমেও ভিসা প্রসেসিং করে গ্রিস যাওয়া যায়।

গ্রিস ১ ইউরো বাংলাদেশের কত টাকা?

মুদ্রা বিনিময়ের হার প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। তবে বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী, গ্রিস ১ ইউরো সমান বাংলাদেশের প্রায় ১২৬ টাকা।

বাংলাদেশ থেকে গ্রিস যেতে কত সময় লাগে?

সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় ট্রানজিটসহ যেতে হয়। বিমানে করে বাংলাদেশ থেকে গ্রিস পৌঁছাতে সাধারণত প্রায় ২৪ ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময় লাগতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *