বাংলাদেশের সরকারি চাকুরিবাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদের নাম হলো অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক। বিশেষ করে যারা এইচএসসি পাস করার পর একটি সম্মানজনক সরকারি চাকুরি খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ পদ। তবে চাকুরিপ্রার্থীদের মনে প্রায়শই একটি প্রশ্ন জাগে যে, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের কাজ কি? মূলত একটি সরকারি অফিসের প্রশাসনিক চাকা সচল রাখতে এই পদের গুরুত্ব অপরিসীম।
Table of Contents
প্রশাসন ক্যাডার বা বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের যেকোনো দপ্তরে এই পদটিকে অফিসের প্রাণ হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিককে একই সাথে দাপ্তরিক সাধারণ কাজ এবং কম্পিউটারে টাইপিং বা মুদ্রাক্ষরণের কাজ করতে হয়। এই নিবন্ধে আমরা এই পদের কাজের ধরণ, বেতন এবং দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মানে কি?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অফিস সহকারী (Office Assistant) এবং কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক (Computer Typist)—এই দুটি পদের সমন্বিত রূপই হলো এটি। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অফিসের সাধারণ ফাইলিং, চিঠিপত্র আদান-প্রদান এবং কম্পিউটারে বিভিন্ন খসড়া কম্পোজ করার কাজ করেন, তিনিই অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক। সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন অফিসিয়াল ডকুমেন্ট প্রস্তুত করার মূল কারিগর হলেন তারা।
পদবি ও গ্রেড বিন্যাস
সরকারি অফিসের গঠনভেদে এই পদটিকে কোথাও ‘অফিস সহকারী’ আবার কোথাও ‘নিম্নমান সহকারী’ বলা হয়। ইংরেজিতে এর অফিসিয়াল পদবি হলো Office Assistant Cum Computer Typist।
- গ্রেড: এটি জাতীয় বেতন স্কেলের ১৬তম গ্রেডের একটি পদ।
- শ্রেণী: এটি সরকারের তৃতীয় শ্রেণীর (Class III) একটি স্থায়ী পদ।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাধারণত এইচএসসি (HSC) বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই এই পদে আবেদন করা যায়। সাথে নির্দিষ্ট টাইপিং স্পিড থাকা আবশ্যক।
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের প্রধান দায়িত্ব ও কাজ
একটি সরকারি দপ্তরের সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে একজন অফিস সহকারীকে বহুমুখী দায়িত্ব পালন করতে হয়। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের কাজ কি তার একটি বিস্তারিত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. চিঠিপত্র লিখন ও মুদ্রাক্ষরণ (Typing and Drafting)
এই পদের সবচেয়ে প্রধান কাজ হলো অফিসের যাবতীয় অফিসিয়াল চিঠিপত্র কম্পিউটারে টাইপ করা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রতিবেদন, অফিস আদেশ, এবং স্মারক লিপি কম্পোজ করা তাদের প্রতিদিনের রুটিন কাজ।
২. নথি ব্যবস্থাপনা ও ফাইল উপস্থাপন (File Management)
সরকারি অফিসের প্রাণ হলো নথি বা ফাইল। যাবতীয় নথি সর্টিং করা, জীর্ণ ও পুরাতন ফাইল কভার পরিবর্তন করে নতুন কভার লাগানো এবং ফাইলের ওপর কম্পিউটার কম্পোজের মাধ্যমে নথির বিষয়, নম্বর ও বন্ধের তারিখ লিপিবদ্ধ করা তাদের কাজ।
৩. রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণ
প্রতিটি সরকারি অফিসে অসংখ্য রেজিস্টার থাকে। যেমন—আগত পত্রের ডায়েরি, নির্গত পত্রের ডায়েরি, হাজিরা খাতা এবং স্টোর রেজিস্টার। এই সবগুলি রেজিস্টার নিয়মিত হালনাগাদ রাখা একজন অফিস সহকারীর আবশ্যিক কাজ।
৪. বিল ও হিসাব সংক্রান্ত কাজ
কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যাতায়াতের গাড়ি ভাড়ার নোট তৈরি, টিএ (TA) বিল এবং বিভিন্ন প্রকার ব্যয়ের মঞ্জুরী তৈরি করে হিসাব শাখায় প্রেরণ করাও তাদের কাজের অংশ। এছাড়া অধিকাল ভাতার বিল প্রস্তুত করতেও তারা সহায়তা করেন।
৫. টেন্ডার বা দরপত্র সংক্রান্ত সহায়তা
সরকারি অফিসের কেনাকাটা বা টেন্ডারের ক্ষেত্রে অফিস সহকারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। টেন্ডার সিডিউল তৈরি, বিক্রয় এবং দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন টাইপ করার কাজে তারা সরাসরি জড়িত থাকেন।
এক নজরে কাজের তালিকা (Bullet Points)
আপনার বোঝার সুবিধার্থে একজন অফিস সহকারীর দৈনন্দিন কাজগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- যাবতীয় নথি বা ফাইল সর্টিং করে র্যাকে সুসজ্জিত রাখা।
- বিভিন্ন ফাইল সঠিক উপায়ে বাঁধাই করার ব্যবস্থা করা।
- অফিসের বিভিন্ন সরঞ্জাম যেমন আসবাবপত্র, সিলিং ফ্যান ইত্যাদি পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য অফিস সহায়ক বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে তদারকি করা।
- বাসা বরাদ্দ সংক্রান্ত দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা।
- উপস্থিতি ও ছুটির রেকর্ড মেইনটেইন করা।
- ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সময়ে সময়ে অর্পিত যেকোনো দায়িত্ব পালন।
বেতন স্কেল ও সুযোগ-সুবিধা
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদটি ১৬তম গ্রেডের হওয়ায় ২০১৫ সালের বেতন স্কেল অনুযায়ী এদের মূল বেতন শুরু হয় ৯,৩০০ টাকা থেকে। এর সাথে যুক্ত হয় বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং যাতায়াত ভাতা। চাকরির বয়স বাড়ার সাথে সাথে ইনক্রিমেন্ট এবং পদোন্নতির মাধ্যমে উচ্চতর পদে যাওয়ার সুযোগ থাকে। বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে অনেকেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা (AO) বা প্রধান সহকারী পদে উন্নীত হতে পারেন।
আরও জেনে নিতে পারেনঃ ক্রোয়েশিয়া ভিসা দাম কত
ক্যারিয়ার গাইডলাইন: কীভাবে এই পদে চাকুরি পাবেন?
এই পদে চাকুরির জন্য আপনাকে প্রধানত দুটি ধাপে পরীক্ষা দিতে হবে। প্রথমে প্রিলিমিনারি বা লিখিত পরীক্ষা এবং এরপর টাইপিং টেস্ট। টাইপিং টেস্টে সাধারণত বাংলায় প্রতি মিনিটে ২০ শব্দ এবং ইংরেজিতে ২০ শব্দের গতি চাওয়া হয়। তাই আপনি যদি এই পেশায় আসতে চান, তবে কম্পিউটারে বাংলা (বিজয় বা অভ্র) এবং ইংরেজি টাইপিংয়ে দক্ষ হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের বেতন কত?
১৬তম গ্রেড অনুযায়ী এই পদের মূল বেতন ৯,৩০০ টাকা। তবে সব ভাতা মিলিয়ে শুরুতে প্রায় ১৫-১৬ হাজার টাকা মাসিক বেতন পাওয়া যায়।
এই পদে আবেদনের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী?
সাধারণত যেকোনো স্বীকৃত বোর্ড থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি (HSC) পাস হতে হয়।
কম্পিউটার টাইপিং স্পিড কত লাগে?
অধিকাংশ সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বাংলায় ২০ এবং ইংরেজিতে ২০ শব্দ প্রতি মিনিট স্পিড চাওয়া হয়।
অফিস সহকারী কি প্রশাসনিক পদ?
হ্যাঁ, এটি একটি প্রশাসনিক সাপোর্ট পদ। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে তারা সহায়তা করে থাকেন।
মুদ্রাক্ষরিক মানে কি?
মুদ্রাক্ষরিক বলতে মূলত টাইপিস্ট বা যিনি কম্পিউটারে লেখালেখির কাজ করেন তাকে বোঝায়।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হলেন সরকারি দপ্তরের কারিগরি ও প্রশাসনিক সেতুবন্ধন। তাদের দক্ষতা এবং পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করেই একটি অফিসের কাজের গতি নির্ধারিত হয়। যারা কম্পিউটারে কাজ করতে পছন্দ করেন এবং সরকারি চাকুরির মাধ্যমে দেশের সেবা করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার সুযোগ। উপরে বর্ণিত অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের কাজ কি সম্পর্কিত আলোচনা থেকে আশা করি আপনি আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েছেন।